এই শীতে ঘুরে আসুন মেঘালয়ের ডাউকি এবং আশেপাশের জায়গায়

অনেকেই মনে করেন মেঘালয় বর্ষাকালে ঘোরার জায়গা। তবে শীতকালে মেঘালয় আরো বেশি অপরুপ। নীল স্বচ্ছ পানি - ক্যাম্পিং - বোটিং এগুলো অন্য সময়ে পাবেন না। মেঘালয় ঘোরার জন্য ডাউকি পোর্ট হয়ে ভিসা এন্ট্রি থাকতে হবে। অনেকের বেনাপোল থেকে ভিসা থেকে করানো থাকে তারা এম্বাসি তে ৩০০ টাকা দিয়ে এপ্লাই করে পোর্ট অ্যাড করে নিতে পারবেন।
Living Route Village
লিভিং রুট ভিলেজ (Living Route Village)
ট্যুর-প্ল্যান
বৃহঃবার রাতের ট্রেনে উঠে পড়ুন সিলেটের জন্যে, ভোরে সিলেট নেমে স্টেশনের সামনে ব্রেকফাস্ট শেষ করে একটু সামনেই তামাবিলের বাস পাবেন, উঠে পড়বেন, ভাড়া ৬৫ টাকা।
তামাবিল পৌছে গেলে বাস থেকে নেমে হেটেই একটু সামনে ইমিগ্রেশন। ইমিগ্রেশনে ডলারের পরিবর্তে টাকা থাকলে একটু উপদেশবাণী দিবে, ভয়ও দিয়ে বলবে ভারতীয়রা টাকা থাকলে ঢুকতে দিবেনা। শুনে কাজ শেষ করে কাস্টমসে ঢুকে পড়ুন। সব কাজ শেষ করে ভারতে ঢুকে পড়ুন, ঐপাশে ইমিগ্রেশন কাস্টমস একই সাথে , হেটে একটু সামনে যেতে হয়। ভারতের এই পোর্টের ইমিগ্রেশন পুরো হাতে কলমে হয়। কাস্টমসেও টাকা না এনে ডলার আনার জন্য উপদেশবাণী দিবে। ইমিগ্রেশন শেষ হয়ে গেলে ক্যাব (১০০ রুপি) / অথবা ১০-১৫ মিনিট হেটে  ডাউকি বাজারে চলে যাবেন। সেখানে টাকা/ডলারগুলো ভাঙ্গিয়ে নিবেন, এখানে অনলাইন রেট থেকে ১-২ টাকা কম পাবেন শ'য়ে। এটাই সর্বোচ্চ অবশ্য, কয়েকটা দোকানে কথা বললে সর্বোচ্চ কত পাবেন তার ধারণা হয়ে যাবে। ঘড়ি/মোবাইলে সময় আধঘন্টা কমিয়ে ভারতীয় টাইম সেট করে ফেলুন।
Mysterious Crangsuri
রহস্যময় ক্রাংসুরি (Mysterious Crangsuri)
তারপর চারজন হলে ক্যাব আর ৮-১০ জন হলে জিপ বুক করুন | রুট হবে ডাউকি থেকে কাছের স্পটগুলো (নিচে যেগুলোর কথা বলেছি) ঘুরিয়ে ডাউকি ফেরত এসে স্নোনেংপেডাং গ্রামে নিয়ে যাবে। ক্যাবে ১৫০০-২০০০ রুপির মধ্যে বুক করার চেষ্টা করবেন।
আমরা ক্যাব নিয়েছিলাম একটা। প্রথমে ডাউকি ব্রিজ পার হয়ে একটু সামনে দাড়াবেন, সেখানে উপর থেকে জাফলং দেখতে পাবেন, আর নিচে সবুজ পানির ওপর নৌকাগুলোর ভেসে থাকা দেখতে দেখতে আনমনা হয়ে যাবেন। আবার ক্যাবে উঠে পড়ুন, বাংলাদেশ থেকে মেঘালয়ের যে পাহাড়গুলো দেখেন, সেই পাহাড়গুলোর কিনার দিয়েই বর্ডারের সমান্তরালে উচু নিচু পাহাড়ি পথে এগিয়ে যাবে গাড়ি, নিচেই বাংলাদেশ দেখতে পাবেন, নেটওয়ার্ক ও পাবেন বাংলাদেশের। এবার পথেই বড় মাপের কয়েকটা ফলস পাবেন, আমরা একটায় নেমে অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিয়েছিলাম , চাইলে গোসল করতে পারবেন। ফলসগুলো ঘোরা শেষ হলে এরপর পড়বে রিওয়াই ভিলেজ, সেখানে ১০-১৫ মিনিটের মত পায়ে হেটে নিচে নেমে দেখা মিলবে লিভিং রুট ব্রিজের। এখানে এন্ট্রি টিকেট ১৫/২০ রুপি। বিশালাকার গাছের শেকড় পেচিয়ে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া এই ব্রিজের নিচ থেকে পানির স্ট্রিম চলে গেছে বাংলাদেশে। এখানে থেকে উপরের দিকে উঠে গেলে নহওয়াত ভিউ পয়েন্ট , বাংলাদেশ দেখা যায় এখান থেকে। আমরাও যেমন জাফলং বিছানাকান্দিতে গিয়ে ভারতকে দেখি, তেমনি ভারতীয় রাও বাংলাদেশ দেখার জন্য এখানে পাড়ি দেয় |
:
আবার আগের রাস্তায় উপরে চলে আসুন, ক্যাবে উঠে নেক্সট গন্তব্য মাওলিনং ভিলেজ! এশিয়ার সবথেকে পরিষ্কার এবং সম্ভবত সবথেকে সুন্দর গ্রাম। পুরো গ্রামটা সাজানো গোছানো একটা রিসোর্টের মত। ঘুরতে ঘুরতে এখানে লাঞ্চ সেরে ফেলুন, যদিও বিকাল হয়ে যাবে এ পর্যন্ত আসতে।
এরপর ক্যাব ডাউকি বাজার ফিরে স্নোনেংপেডাং ভিলেজ নিয়ে যাবে, যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। আগে থেকে যোগাযোগ করে আমরা তিনজনের একটা তাবু বুক করে রেখেছিলাম। তাবু সাধারনত সিঙ্গেল ডাবল আর ট্রিপল পার্সনের জন্যে হয়ে থাকে। সিঙ্গেলগুলো ৪০০ রুপি, ডাবলগুলো ৭০০ আর ট্রিপলগুলো ১০০০ রুপি। থাকার যাবতীয় জিনিসপত্র তাবুতেই থাকবে।
আমরা ঠিক উমগট নদীর (অনেকেই নদীর নামকে গ্রামের নামের সাথে মিলিয়ে ফেলেন; মনে রাখবেন, গ্রামের নাম স্নোনেংপেডাং আর নদীর নাম উমগট) পাশেই ক্যাম্প পেয়েছিলাম। জিনিসপত্র তাবুতে রেখে নদীর আশপাশটা দেখতে বেরোবেন। প্রচুর পাথর নদীর পাড়ে। তাই নদীর পাড়ে ঘোরার সময় সাবধানে হাটবেন। এরপর পাশেই ডিনার সেরে নিয়ে নদীর পাশে সেট করা বাশের বেঞ্চগুলোতে বসে জুড়ে দিতে পারেন আড্ডা গান আর তারা দেখা।
শনিবার
সকালে উঠেই ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিন। ভোরে উঠতে পারলে হেটে হেটে ঝুলন্ত ব্রিজ সহ আশপাশটা আবার ঘুরে নিন। ঘুরে এসে নদীর পাশে গরম গরম খিচুড়ী দিয়ে মুরগীর মাংস খেতে ভুলবেন না। স্বচ্ছ পানিতে ৪৫ মিনিট বোটিং এর জন্য ৫০০ রুপি নিবে, তিনজন বা চারজন বসতে পারবেন। সবার লাইফ জ্যাকেট নেওয়া বাধ্যতামূলক। ৫০ রুপি করে পড়বে প্রতিটা। নৌকাগুলো নদীর আপস্ট্রিমে একটা ফলস পর্যন্ত নিয়ে যাবে। যাবার সময় নদীর তলদেশে পাথরের ভাজে ভাজে মাছের ছোটাছুটি দেখতে ভুলবেন না।
সাঁতার দিতে চাইলে চেস্টারকে আগেই বলে রাখবেন। সে লাইফ জ্যাকেট রেডী করা রাখবে। সাধারনত ক্যাম্পের পাশেই যেখানে কম গভীর সেখানে সাঁতরাতে দিবে। অবশ্যই মনে রাখবেন নদীর বেশিরভাগ স্থানেই স্বচ্ছ পানি বলে কম গভীর মনে হবে। কিন্তু পানিতে যথেষ্ট গভীর থাকে বলে সাবধানে সাতার দিবেন। এছাড়াও কায়াকিং, জাম্পিং, ক্যাবল কার এক্টিভিটিজ করতে পারেন চাইলে। যেহেতু শর্ট টাইম আর প্যাকেট ট্যুর তাই এগুলো না করেই ১২ টার মধ্যেই বেরিয়ে পড়তে হবে। এরপর ক্যাব ঠিক করবেন আবার। ক্রাংসুরি ফলস ঘুরিয়ে তামাবিল বর্ডারে নামিয়ে দেয়ার জন্য। ক্যাবে ১৫০০-১৮০০ রুপি পড়বে । প্রায় এক ঘন্টা লাগবে স্নোনেংপেডাং গ্রাম থেকে ক্রাংসুরি যেতে।
ক্রাংসুরি যাবার পথের রাস্তাটা আমার কাছে অপরুপ সুন্দর মনে হয়েছে। কিছুক্ষণ পরপর ল্যান্ডস্কেপের পরিবর্তন আপনাকে মোহময় করে তুলবে। দুরে দুরে থাকা গ্রামগুলো দেখে মাঝে মাঝে মনে হহতে পারে আপনি হলিউডে চলে এসেছেন!
ক্রাংসুরির উপরে পৌছে ক্যাবের পার্কিং চার্জ ৩০ রুপি আমাদেরকেই বহন করতে হয়েছে। গোসল করার মত সব জিনিসপত্র নিয়ে এবার ফলসের জন্য নিচে নামা শুরু করুন। প্রায় ১০- ১৫ মিনিট নিচে নামতে হবে। হঠাৎই দেখবেন ভিউপয়েন্ট থেকে ক্রাংসুরির নীলাভ পানি। এটাই ক্রাংসুরি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। খনিজ সমৃদ্ধ ভূমি হওয়ার কারনে এমনটা দেখা যায়।

ক্রাংসুরি প্রবেশে ৪০ রুপি টিকেট কাটতে হবে। সাঁতরাতে চাইলে ৩০ রুপি দিয়ে লাইফ জ্যাকেট। ভারতে এই জিনিসটা খুব চোখে পড়ার মত। ট্যুরিস্ট স্পটগুলোতে সেফটিকে তারা প্রথম গুরুত্ব দিয়ে দেখে। আমাদের জাফলং এ এমনভাবে বাধ্যতামূলক করা হলে প্রতিবছর পানিতে ডুবে যে মৃত্যুগুলো হয় সেগুলো কমানো সম্ভব হতো। যাহোক, দুপুর বেলায় ক্রাংসুরির নীলাভ পানির ছটায় রংধনু দেখতে পাবেন। সাঁতরাতে চাইলেও নেমে পড়ুন, তবে বেশিক্ষণ থাকবেন না। ক্রাংসুরির পানি প্রচন্ড ঠান্ডা থাকে। বিকাল আড়াইটার আগে উঠে পড়তে হবেই। উঠে এসে খাওয়া দাওয়া সেরে নিবেন পার্কিং এর পাশে। মেঘালয়ের হোটেলগুলোতে খাবার রান্নার রুচি অনেকটাই আমাদের মত। খাবার পেট পুুুরে খেতে পারবেন।

লাঞ্চ শেষ করে এবার রওনা দিবেন তামাবিলের পথে । দেড় থেকে দুঘন্টা লাগবে তামাবিল পৌছতে। সাথে রুপি থাকলে অবশ্য একটু আগে রওনা দিয়ে ডাউকি বাজারে এসে টাকায় ভাঙ্গিয়ে নিবেন।
ভারতীয় ইমিগ্রেশন ভারতীয় ৫:৩০ টায় বন্ধ হয়ে যায়।

দুপাড়ের কাস্টমস - ইমিগ্রেশন শেষ করে বর্ডার পার করে যেখানে বাস থেকে নেমেছিলেন সেখানে অপেক্ষা করলেই সিলেটের বাস পাবেন। সিলেট পৌছে রাতের বাসে ঢাকায় ব্যাক করবেন।

চারজনের খরচ :
শুক্রবার -
ঢাকা - সিলেট           ৩২০*৪= ১২৮০ টাকা
সিলেট - তামাবিল     ৬৫*৪  = ২৬০ টাকা
ব্রেকফাস্ট                ৪০*৪  = ১৬০ টাকা
বর্ডার - ডাউকি         ১০০ রুপি ( হেটেও যেতে পারেন, ১০-১৫ মিনিট লাগবে)
ক্যাব বুক                 ১৮০০ রুপি
এন্ট্রি টিকেট             ২০*৪ = ৮০ রুপি
খাওয়া -দুপুর রাত     ২৫০*৪ = ১০০০ রুপি
ক্যাম্পিং                  ৭০০*২ = ১৪০০ রুপি
শনিবার -
বোট                        ৫০০+২০০ (লাইফ জ্যাকেট) রুপি
ক্যাব                        ১৫০০ রুপি
এন্ট্রি + জ্যাকেট        (৪০+৩০)*৪ = ২৮০ রুপি
পার্কিং                     ৩০ রুপি
খাওয়া                     ২৫০*৪ = ১০০০ রুপি( সকাল দুপুর)
তামাবিল -সিলেট     ৬৫*৪   = ২৬০ টাকা
সিলেট - ঢাকা          ৪৮০*৪ = ১৯২০ টাকা
খাওয়া                     ১০০*৪  = ৪০০ টাকা
মোট - ৪২৭০ টাকা এবং ৭৮৯০ রুপি (১০০ টাকায় ৮২ রুপি করে ধরলে ৯৬২৫ টাকা)
তাহলে ঢাকা টু মেঘালয়ের ডাউকি টু ঢাকা একজনের সর্বমোট খরচ ৩৪৭৩ টাকা
* দুদিন সবসময় একসাথেই থাকা হবে বলে ভারতীয় সিম না কিনলেও চলবে
* পার্সোনাল হাত খরচ উক্ত খরচের সাথে নিয়ে যেতে হবে
* ক্যাবের জন্য বার্গেইন করলে কিছু কমাতে পারবেন খরচ
* কোনো জায়গায় অতিরিক্ত সাহস দেখাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাবেন না
* মেঘালয়ের মানুষজনের মানসিকতা অনেক ভালো মনে হয়েছে আমাদের। এমন কোনো কাজ করবেন না যাতে তারা বাংলাদেশ সম্পর্কে খারাপ মনোভাব অর্জন করে
* কোথাও প্রকৃতির ক্ষতিমূলক কোনো কাজ করবেন না
Previous
Next Post »

Popular Posts